এআই ডেটা সেন্টারের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে নতুন ব্যাটারি প্রযুক্তি আনছে জিএম

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ০৯ জুন, ২০২৬
https://techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png নিজস্ব প্রতিবেদক
https://techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png
  ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য প্রসারের সাথে সাথে এর পেছনে থাকা শক্তিশালী ডেটা সেন্টারগুলোর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে এক অভিনব প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকট মেটাতে এবার সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যুক্ত হচ্ছে বিশ্বের শীর্ষ গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোও। 

এই দৌড়ে সর্বশেষ ও সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে যোগ দিল জেনারেল মোটরস বা জিএম। কোম্পানিটি এআই ডেটা সেন্টার এবং জাতীয় গ্রিডের জন্য পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী বিশাল আকারের ‘এআরজি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম’ (ইএসএস) বা গ্রিড-স্কেল ব্যাটারি তৈরির এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

প্রতিযোগিতায় জিএম-এর বৈপ্লবিক প্রবেশ
এর আগে ব্যাটারি রিসাইক্লিং স্টার্টআপ ‘রেডউড মেটেরিয়ালস’ এবং মার্কিন অটোমোবাইল জায়ান্ট ‘ফোর্ড’ গ্রিড-স্কেল ব্যাটারি বাজারে প্রবেশের ঘোষণা দিলেও, জিএম-এর নতুন পদক্ষেপটিকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা অনেক বেশি বৈপ্লবিক ও দূরদর্শী বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

প্রথম চেইন-ব্রেকার: সোডিয়াম-আয়ন রসায়ন
ক্যালিফোর্নিয়া ভিত্তিক এনার্জি স্টোরেজ স্টার্টআপ ‘পিক এনার্জি’-এর সাথে এক মেগা-পার্টনারশিপের ঘোষণা দিয়েছে জিএম। এই অংশীদারিত্বের আওতায় জিএম সম্পূর্ণ নতুন এক ধরনের ‘সোডিয়াম-আয়ন’ ব্যাটারি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করছে, যা মূলত জাতীয় গ্রিড ও ডেটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যাকআপের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। চীন বাদে বিশ্বের আর কোনো বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত গ্রিড বা ডেটা সেন্টারের জন্য সোডিয়াম-আয়ন সেল তৈরির এমন ঘোষণা দেয়নি।

জিএম-এর দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা
জিএম-এর ব্যাটারি ও সাসটেইনেবিলিটি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট কার্ট কেল্টি বলেন, "গ্রিড বা ইএসএস বাজারের পারফরম্যান্সের জন্য সোডিয়াম-আয়ন রসায়নটি একদম মোক্ষম।" এই প্রজেক্টের জন্য নির্দিষ্ট বিনিয়োগের অংক প্রকাশ না করলেও, নতুন ব্যাটারি রসায়ন বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনতে জিএম ইতিমধ্যেই ৯০০ মিলিয়ন (৯০ কোটি) ডলারের একটি তহবিল ও নতুন ডেভেলপমেন্ট সেন্টার উৎসর্গ করেছে।

কেন সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এত গুরুত্বপূর্ণ
সাধারণ লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির তুলনায় সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে ব্যবহৃত মূল উপাদানগুলো অত্যন্ত সস্তা, দীর্ঘস্থায়ী এবং এটি অতিরিক্ত গরম হয় না। তবে এর একমাত্র অসুবিধা হলো-একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ধরে রাখতে এর আকার ও ওজন কিছুটা বেশি হয়। কিন্তু ডেটা সেন্টার বা পাওয়ার গ্রিড যেহেতু এক জায়গায় স্থায়ী থাকে (গাড়ির মতো ওজনের চিন্তা করতে হয় না), তাই সেখানে বড় আকারের ব্যাটারি ব্যবহারে কোনো সমস্যা নেই।

কম খরচে বেশি নিরাপত্তা
সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো-অতিরিক্ত গরম হওয়ার ঝুঁকি না থাকায় পিক এনার্জির তৈরি এই গ্রিড-স্কেল ব্যাটারিতে কোনো ব্যয়বহুল কুলিং সিস্টেম (শীতলীকরণ ব্যবস্থা) বা অগ্নি-নির্বাপক সিস্টেমের প্রয়োজন পড়ে না। 

জিএম-এর এনার্জি স্টোরেজ কমার্শিয়ালাইজেশন ডিরেক্টর পল মেনসন বলেন, "ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সবচেয়ে কঠিন ও সেরা অংশ হলো-কোনো বাড়তি পার্টস বা অংশ না রাখা। পার্টস বাদ দিলে পার্টস নষ্ট হওয়ার সমস্যাও চিরতরে দূর হয়ে যায়।" এর ফলে ব্যাটারির উৎপাদন খরচ যেমন কমবে, তেমনই এর রক্ষণাবেক্ষণ বা মেইনটেন্যান্স খরচও শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।

২০২৮ সালের পরীক্ষামূলক উৎপাদনের লক্ষ্য
জিএম-এর নিজস্ব ‘ব্যাটারি সেল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার’-এ আগামী ২০২৮ সাল থেকে এই সোডিয়াম-আয়ন সেলের ট্রায়াল বা পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হবে। তবে এই দীর্ঘমেয়াদী প্রযুক্তির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জিএম এলজি এনার্জি সলিউশন-এর কাছে ‘লিথিয়াম আয়রন ফসফেট’ সেল বিক্রি করবে, যা এখনই এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমে ব্যবহার করা যাবে।

রেডউডের সঙ্গে অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ
গাড়ির ব্যাটারি ও ডেটা সেন্টারের জ্বালানি সমন্বয়ের এই প্রজেক্টে জিএম তাদের কাজের পরিধি বাড়িয়েছে টেসলার প্রাক্তন এক্সিকিউটিভ জে.বি. স্ট্রবেলের রিসাইক্লিং স্টার্টআপ ‘রেডউড মেটেরিয়ালস’-এর সাথে। জিএম তাদের ইভি বা বৈদ্যুতিক গাড়ির পুরনো ও বাতিল হয়ে যাওয়া প্রায় ১০,০০০ ব্যাটারি প্যাক রেডউডের কাছে পাঠাচ্ছে। রেডউড ইতিমধ্যেই নেভাদায় একটি এআই ডেটা সেন্টারে এই পুরনো ব্যাটারিগুলো সফলভাবে জুড়ে দিয়ে ১২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি মাইক্রোগ্রিড পরিচালনা করছে, যা এআই প্রসেস করার সময় জিপিইউ-এর বিদ্যুৎ ওঠানামা বা ফ্লাকচুয়েশন নিয়ন্ত্রণ করে।

কারখানায় ব্যাটারি ব্যবহারে কোটি ডলার সাশ্রয়
পাশাপাশি, জিএম নিজেই তাদের মিশিগানের একটি কারখানার জন্য রেডউডের কাছ থেকে ৭.২ মেগাওয়াট-আওয়ারের একটি ব্যাটারি সিস্টেম কিনছে, যা কারখানার পিক-আওয়ারের বিদ্যুৎ বিল কমাতে এবং লোডশেডিংয়ের সময় ব্যাকআপ দিতে সাহায্য করবে। এর ফলে কারখানার লাইফটাইমে প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে।

এআই অবকাঠামোর সংকট মোকাবিলায় নতুন দিগন্ত
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই জেনারেশনের জন্য যে বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং পাওয়ার এবং বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তা সাধারণ গ্রিডের ওপর মারাত্মক চাপ ফেলছে। মাইক্রোসফট, গুগল বা ওপেনএআই-এর মতো জায়ান্টরা যখন পারমাণবিক বিদ্যুতের খোঁজ করছে, তখন অটোমোবাইল খাতের ব্যাটারি প্রযুক্তিকে ডেটা সেন্টারে কাজে লাগানোর এই মেলবন্ধন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামোগত সংকট দূরীকরণে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করল। সূত্র: টেক রাডার, টেকক্রাঞ্চ

image

আপনার মতামত দিন