নতুন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ বা চার্জার কেনার পর অনেক ব্যবহারকারী একটি বিষয় প্রায়ই লক্ষ্য করেন, ইউএসবি পোর্ট বা ক্যাবলের ভেতরের অংশে হঠাৎ করে বেগুনি রঙের উপস্থিতি। প্রথম দেখায় এটি অনেকের কাছেই কেবলমাত্র একটি নান্দনিক বা ডিজাইনভিত্তিক পছন্দ বলে মনে হতে পারে, যেন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পণ্যটিকে আরও আকর্ষণীয় ও আলাদা করে উপস্থাপন করার জন্য এই রঙ ব্যবহার করেছে।
কিন্তু বাস্তবে এই ছোট্ট রঙের ভিন্নতার পেছনে লুকিয়ে আছে আরও গভীর একটি প্রযুক্তিগত ইঙ্গিত, যা সরাসরি সম্পর্কিত ডিভাইসের চার্জিং ক্ষমতা, পাওয়ার ডেলিভারি প্রযুক্তি এবং ডেটা ট্রান্সফার সক্ষমতার সঙ্গে। আধুনিক ইউএসবি প্রযুক্তিতে রঙ শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি ডিভাইসের পারফরম্যান্স ও সক্ষমতার একটি সূক্ষ্ম সংকেত হিসেবেও কাজ করে।
ইউএসবি পোর্টের রঙ কী নির্দেশ করে?
ইউএসবি প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক মান নির্ধারণকারী সংস্থা ইউএসবি ইমপ্লিমেন্টার্স ফোরাম (ইউএসবি-আইএফ) বিভিন্ন ইউএসবি সংস্করণ চিহ্নিত করতে নির্দিষ্ট কিছু রঙ ব্যবহার করে। সাধারণত সাদা রঙের পোর্ট ইউএসবি ১.০, কালো রঙের পোর্ট ইউএসবি ২.০ এবং নীল রঙের পোর্ট ইউএসবি ৩.০ বা ৩.১ সুপারস্পিড প্রযুক্তির প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
তবে বেগুনি রঙের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নেই। ফলে কোনো ডিভাইসে বেগুনি পোর্ট দেখা গেলে সেটি সাধারণত নির্মাতার নিজস্ব প্রযুক্তিগত পরিচয় বহন করে।
হুয়াওয়ের ‘সুপারচার্জ’ প্রযুক্তির পরিচয়
বেগুনি রঙের ইউএসবি পোর্ট জনপ্রিয় করে তোলে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ‘সুপারচার্জ’ প্রযুক্তিসমৃদ্ধ চার্জার ও ক্যাবলে এই রঙ ব্যবহার করত। বিশেষ করে ৪০ ওয়াট বা তার বেশি ক্ষমতার দ্রুত চার্জিং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বেগুনি রঙকে আলাদা পরিচিতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হুয়াওয়ে তাদের আরও শক্তিশালী ৬৬ ওয়াট ও ১০০ ওয়াট চার্জারগুলোতে বেগুনির পরিবর্তে কমলা রঙ ব্যবহার শুরু করেছে।
বিশ্ববাজারে বেগুনি পোর্ট কম দেখা যায় কেন?
ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক বাজারে বেগুনি ইউএসবি পোর্ট পরিচিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে এটি তুলনামূলক বিরল। এর অন্যতম কারণ হলো চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য বিরোধের জেরে হুয়াওয়ের পণ্যের ওপর আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা। ফলে প্রতিষ্ঠানটির স্মার্টফোন ও আনুষঙ্গিক পণ্য পশ্চিমা বাজারে সীমিতভাবে পাওয়া যায়।
শুধু বেগুনি নয়, অন্য রঙও আছে
বর্তমানে বিভিন্ন নির্মাতা নিজেদের প্রযুক্তি আলাদা করে তুলে ধরতে নানা রঙের ইউএসবি পোর্ট ব্যবহার করছে। উদাহরণ হিসেবে লাল বা হলুদ রঙের পোর্ট অনেক সময় কম্পিউটার বন্ধ থাকলেও চার্জিং সুবিধা নির্দেশ করে। আবার কিছু ক্ষেত্রে সবুজ রঙ ব্যবহার করা হয় বিশেষ দ্রুত চার্জিং প্রযুক্তি বা ব্র্যান্ড পরিচয়ের অংশ হিসেবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, পোর্টের রঙ দেখে চার্জারের সক্ষমতা বিচার করা সবসময় নির্ভরযোগ্য নয়।
রঙ নয়, গুরুত্ব দিন স্পেসিফিকেশনে
অনেক ব্যবহারকারী রঙ দেখে চার্জার বা ক্যাবল নির্বাচন করেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ একই রঙের দুটি চার্জারের ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সামঞ্জস্য সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে। ফলে ডিভাইস প্রত্যাশিত গতিতে চার্জ নাও হতে পারে। এমনকি অনুপযুক্ত ক্যাবল ব্যবহারে ব্যাটারির ক্ষতি বা নিরাপত্তাজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
ভালো ক্যাবল চেনার উপায়
নিরাপদ ও কার্যকর চার্জিংয়ের জন্য ইউএসবি-আইএফ অনুমোদিত এবং সর্বশেষ ইউএসবি পাওয়ার ডেলিভারি (পিডি) ৩.১ সমর্থিত ক্যাবল বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। এই মানের ক্যাবল ২৪০ ওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম।
অন্যদিকে দ্রুত ডেটা স্থানান্তরের প্রয়োজন হলে ইউএসবি ৩.১, ইউএসবি ৪ অথবা থান্ডারবোল্ট ৫ সমর্থিত ক্যাবল ব্যবহার করা উচিত। এসব প্রযুক্তি প্রতি সেকেন্ডে ৪০ থেকে ৮০ গিগাবিট পর্যন্ত ডেটা স্থানান্তরের গতি দিতে পারে।
রঙ নয়, যাচাই করুন সার্টিফিকেশন
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএসবি পোর্টের আকর্ষণীয় রঙ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে পণ্যের গায়ে থাকা অনুমোদন, বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষমতা, ডেটা স্থানান্তরের গতি এবং নির্মাতার উল্লেখিত প্রযুক্তিগত তথ্য যাচাই করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এতে ডিভাইস নিরাপদ থাকবে এবং কাঙ্ক্ষিত কর্মক্ষমতাও পাওয়া যাবে। সূত্র: টেকক্রাঞ্চ, এনগ্যাজেট