ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করতে যাচ্ছে, তার জন্য মানুষ এখনো প্রস্তুত নয়। এই পরিবর্তন চাকরি, সরকার, ব্যবসা এমনকি মানব সম্পর্ককেও গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। এআইয়ের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বিশ্বকে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এক দশকেই বদলে যেতে পারে বহু শিল্প
‘দ্য টার্বুলেন্ট এআই এরা ইজ হেয়ার: দ্য চয়েসেস উই মেক নাউ আর ক্রিটিক্যাল’ শীর্ষক লেখায় বিল গেটস জানান, এআইয়ের রূপান্তর তিনটি প্রধান ঝুঁকি নিয়ে আসছে, যার মধ্যে কর্মসংস্থান হারানো বা চাকরি চলে যাওয়া হলো প্রথম ঝুঁকি। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এআই কেবল একটি নির্দিষ্ট খাতকে প্রভাবিত করবে না, আইন, গ্রাহকসেবা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সফটওয়্যার এবং উৎপাদন খাতের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রকে গ্রাস করবে। কয়েক প্রজন্মের পরিবর্তনের পরিবর্তে মাত্র এক দশকের মধ্যেই এটি দ্রুত এই শিল্পগুলোকে আঘাত করবে। এআই যুগের এই রূপান্তর হবে মানব ইতিহাসের অন্যতম অশান্ত সময়, যার জন্য সমাজ প্রস্তুত নয়।
প্রাথমিক ও মধ্যম পর্যায়ের চাকরি বেশি ঝুঁকিতে
গেটসের মতে, এআইনির্ভর বিশ্বে প্রাথমিক ও মধ্যম পর্যায়ের চাকরি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, অন্যদিকে নতুন তৈরি হওয়া অনেক চাকরির জন্য বিভিন্ন দক্ষতার প্রয়োজন হবে। বিক্রয় ও গ্রাহক সহায়তা, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, আইনসংক্রান্ত কাজ, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং উৎপাদন খাতসহ বিস্তৃত পরিসরের শিল্পে এআইয়ের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিছু নতুন চাকরি তৈরি হবে, তবে সঠিক নীতিমালা না থাকলে বর্তমানের তুলনায় সেগুলোর সংখ্যা অনেক কম হবে।
স্মার্ট রোবটও প্রতিযোগিতা করবে মানুষের সঙ্গে
বিল গেটসের ধারণা, এই প্রভাব শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই দশকের শেষের মধ্যেই স্মার্ট রোবট নির্মাণ ও আতিথেয়তা খাতের মতো কিছু শারীরিক কাজের ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা শুরু করবে। এই পরিবর্তনের গতিই ভবিষ্যৎকে বিশেষভাবে আশঙ্কাজনক করে তুলেছে। কয়েক প্রজন্মের পরিবর্তনের পরিবর্তে মাত্র এক দশকের মধ্যেই এটি দ্রুত বিভিন্ন শিল্পে প্রভাব ফেলবে। এআই আরও বেশি সক্ষম হয়ে ওঠায় তরুণ কর্মীদের জন্য তাঁদের প্রথম সুযোগটি পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। এর ফলে অভিজ্ঞদের কাছ থেকে শেখা এবং কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও তাঁদের জন্য সীমিত হয়ে যাবে।
এআই বাড়াতে পারে জালিয়াতি ও সাইবার ঝুঁকি
বিল গেটস দ্বিতীয় যে আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন, তা হলো—এআই কীভাবে বর্তমানের ডিজিটাল হুমকিগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। তিনি জালিয়াতি, ডিপফেক, ভুল তথ্য এবং সাইবার আক্রমণের মতো ঝুঁকির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যা এআইয়ের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠতে পারে। এ ছাড়া শক্তিশালী এআই সিস্টেমগুলো সরকারগুলোও বিপজ্জনক উপায়ে ব্যবহার করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বিল গেটস সতর্ক করে বলেন, খারাপ উদ্দেশ্যে কাজ করা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগুলোর হাতে শক্তিশালী নতুন সব হাতিয়ার চলে আসবে।
এআইয়ের গতি নয়, প্রয়োজন সঠিক নীতিমালা
বিল গেটস বিশ্বকে এআইয়ের গতি ধীর করে দেওয়ার পক্ষে নন। তাঁর বিশ্বাস, চিকিৎসক ও শিক্ষকদের সহায়তা করা থেকে শুরু করে সরকারি সেবার মান উন্নত করা পর্যন্ত, সব ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তি বড় ধরনের সুফল বয়ে আনতে পারে। তবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিগুলো সামাল দেওয়ার জন্য নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
মানুষের জন্য কিছু কাজ সংরক্ষণের প্রস্তাব
কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর ব্যবস্থা, জ্বালানি এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বানও জানিয়েছেন গেটস। এ ছাড়া তাঁর প্রস্তাবিত ‘হিউম্যান রিজার্ভড’ ধারণার আওতায় এমন কিছু ক্ষেত্র বা ভূমিকা মানুষের জন্যই সংরক্ষিত রাখার কথা বলেছেন, বিশেষ করে যে কাজে সহানুভূতি এবং মানবিক যোগাযোগের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি, অটোমেশনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের পুনর্বাসন ও সহায়তা তহবিলের জোগান দিতে এআই টোকেন এবং রোবটের ওপর কর আরোপেরও প্রস্তাব করেছেন তিনি। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ভার্জ, ইন্ডিয়া টুডে