ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় শুরু হচ্ছে নতুন অধ্যায়

প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট, ২০২৬
https://techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png নিজস্ব প্রতিবেদক
https://techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png
  ছবি: সংগৃহীত

ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। ‘ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেইস’ বা ইউপিআইয়ের মাধ্যমে এতদিন বিনামূল্যে লেনদেন করা গেলেও এবার বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ফি নেওয়ার প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে। সরকারি পর্যায়ে এখনও মাশুলের হার বা কার্যকর হওয়ার ক্ষেত্র চূড়ান্ত হয়নি। প্রাথমিক প্রস্তাবে বড় অঙ্কের লেনদেনে ০.৩ থেকে ০.৫ শতাংশ ‘মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট’ বা এমডিআর আরোপের কথা বলা হচ্ছে।

সাধারণ গ্রাহকের লেনদেন থাকবে ফ্রি
প্রস্তাব অনুযায়ী, সাধারণ গ্রাহকের লেনদেন এবং ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি বা পিটুপি ইউপিআই লেনদেনে কোনো মাশুল থাকবে না। নির্দিষ্ট সীমার বেশি লেনদেন করা বড় ব্যবসায়ীদের ওপরই মূলত ফি আরোপের কথা ভাবা হচ্ছে। ২ হাজার রুপির বেশি লেনদেনকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। ফলে ছোট ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের দৈনন্দিন লেনদেনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসার কথা নয়।

এক দশকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ইউপিআই
২০১৬ সালে চালুর পর ইউপিআই বিশ্বের অন্যতম বড় রিয়েল-টাইম পেমেন্ট নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ৫৫ কোটিরও বেশি মানুষ এটি ব্যবহার করছেন। ভারতের বাইরেও অন্তত ১১টি দেশে কোনো না কোনোভাবে ইউপিআই পেমেন্ট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। গত অর্থবছরে ইউপিআইয়ে লেনদেনের সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার ১৬০ কোটি ছাড়িয়েছে, যা চালুর প্রথম বছরের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার গুণ বেশি।

ছোট ব্যবসায়ীরাই ইউপিআইয়ের শক্তি
ইউপিআইয়ের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো ছোট ব্যবসায়ীদের সহজে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের সুযোগ। সবজি বিক্রেতা, ট্যাক্সিচালক কিংবা রাস্তার ছোট দোকানদারকে দামি কার্ড টার্মিনাল বা পিওএস মেশিন কিনতে হয়নি। একটি ছাপানো কিউআর কোড দিয়েই তারা অর্থ গ্রহণ করতে পেরেছেন। এতদিন কোনো এমডিআর না থাকায় ব্যবসায়ীরাও ডিজিটাল পেমেন্ট নিতে আগ্রহী ছিলেন।

ফি থেকে বড় আয়ের সম্ভাবনা
ব্রোকারেজ ফার্ম জেফরিজের হিসাবে, ২ হাজার রুপির বেশি লেনদেন মোট ইউপিআই লেনদেনের মাত্র চার শতাংশ। তবে মোট লেনদেনের অর্থমূল্যের প্রায় ৬৭ শতাংশই এই লেনদেনগুলোর মাধ্যমে আসে। ফলে বড় লেনদেনে সামান্য ফি আরোপ করা হলে ব্যাংক ও পেমেন্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ইউপিআই পরিচালনার খরচও কম নয়
ব্যবহারকারীদের কাছে ইউপিআই বিনামূল্যের হলেও এর পেছনে বড় ধরনের পরিচালন ব্যয় রয়েছে। সার্ভার সচল রাখা, তাৎক্ষণিক লেনদেন সম্পন্ন করা, জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং সাইবার হামলা থেকে নেটওয়ার্ক সুরক্ষিত রাখতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। এতদিন ভারতের সরকার বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকির মাধ্যমে এই অবকাঠামো সচল রেখেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ ব্যবস্থা কতটা টেকসই হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

ছোট ব্যবসায়ীদের নিয়ে শঙ্কা
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বড় কোম্পানির বদলে যদি ছোট ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপরও মাশুল চাপানো হয়, তাহলে ইউপিআইয়ের প্রসার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। স্বল্প লাভে ব্যবসা করা ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের জন্য সামান্য ফিও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। এমনকি ২০২৪ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে, ইউপিআই ব্যবহারে সামান্য ফি আরোপ হলেও প্রায় ৭৫ শতাংশ ব্যবহারকারী তা ব্যবহার বন্ধ করার কথা ভেবেছিলেন।

টেকসই ভবিষ্যৎই এখন বড় পরীক্ষা
ইউপিআই এখন নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে। নেটওয়ার্ক তৈরি এবং কোটি কোটি মানুষকে যুক্ত করার পর এবার এটিকে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টেকসই করার পালা। ব্রাজিলের ‘পিক্স’-এর মতো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নামমাত্র ফি নেওয়ার মডেলও ভারতের সামনে উদাহরণ হতে পারে। তবে ইউপিআইয়ের সাফল্য ধরে রাখতে হলে বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় এবং ছোট ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স।

image

আপনার মতামত দিন