মহাজাগতিক ঝড় বা সৌরঝড় কখন পৃথিবীতে আঘাত হানবে, তা আরও নির্ভুলভাবে আগাম জানাতে সক্ষম হয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার নতুন স্যাটেলাইট মিশন পাঞ্চ (PUNCH)।
প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট এনগ্যাজেট জানিয়েছে, নতুন এ প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহার করা গেলে স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হবে।
চার স্যাটেলাইটে সূর্যের সার্বক্ষণিক নজরদারি
সূর্য ও এর বায়ুমণ্ডলে সৃষ্টি হওয়া সৌরঝড় সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালের মার্চে পাঞ্চ মিশন চালু করে নাসা। চারটি মাইক্রোস্যাটেলাইট নিয়ে গঠিত এ মিশনটি সার্বক্ষণিক সূর্যের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছে এবং সূর্য থেকে নির্গত কণার গতিপথ ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করছে।
সম্প্রতি পাঞ্চ মিশনের সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে সৌরঝড়ের পূর্বাভাসে উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথা জানিয়েছেন গবেষকেরা। ২০২৫ সালের ৩১ মে স্যাটেলাইটে ধারণ করা একটি করোনাল মাস ইজেকশন (সিএমই)–এর ধারাবাহিক ছবি বিশ্লেষণ করে নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও কম্পিউটার মডেলের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। সূর্য থেকে বিপুল পরিমাণ প্লাজমা ও চৌম্বকীয় পদার্থ মহাকাশে ছিটকে বের হওয়ার ঘটনাকেই সিএমই বলা হয়, যা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে সংঘর্ষে তীব্র সৌরঝড় সৃষ্টি করতে পারে।
আঘাতের সময় জানাল মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে
গবেষক দল সিএমই–এর গতি, বিস্তার ও আকার বিশ্লেষণ করে বিস্ফোরণের প্রথম ১২ ঘণ্টার তথ্য মডেলে যুক্ত করে। এরপর মডেলটি পূর্বাভাস দেয়, আরও আট ঘণ্টা পর সৌরঝড়টি পৃথিবীতে পৌঁছাবে। বাস্তবে পূর্বাভাসটি মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানে সঠিক প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে সৌরঝড়ের পূর্বাভাসে গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত সময়গত ত্রুটি দেখা যায়। সেই তুলনায় নতুন পদ্ধতিটি অনেক বেশি নির্ভুল বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
গবেষকদের ভাষ্য, পাঞ্চ চালুর আগে সূর্য থেকে পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসা উপাদানের যাত্রাপথের মাত্র পাঁচ ভাগের এক ভাগ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতো। নতুন মিশনের মাধ্যমে এখন পুরো যাত্রাপথ পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি চার মিনিটে একটি করে উচ্চমানের ছবি পাওয়ায় সৌরঝড়ের গতিবিধি আরও স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে।
'যুগান্তকারী' বলছেন গবেষক
যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোর বোল্ডারে অবস্থিত সাউথওয়েস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পাঞ্চ মিশনের প্রধান গবেষক ক্রেইগ ডিফরেস্ট বলেন, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল পাঞ্চ সফল হবে, তবে ফলাফল তাঁদের ধারণারও বাইরে। তাঁর ভাষায়, মহাকাশ আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে পাঞ্চের অগ্রগতি অনেকটা স্টিম ইঞ্জিন থেকে আধুনিক ইঞ্জিনে উত্তরণের মতোই যুগান্তকারী।
ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বাড়বে প্রস্তুতির সুযোগ
তীব্র সৌরঝড় পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রে ভূ-চৌম্বকীয় অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে রেডিও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, স্যাটেলাইটের কার্যক্রম এবং ইন্টারনেট সংযোগে বিঘ্ন ঘটার ঝুঁকি থাকে। তাই সৌরঝড়ের সময় আরও আগে ও নির্ভুলভাবে জানা গেলে এসব খাতে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, 'স্পেস ওয়েদার' সাময়িকীতে পর্যালোচনার জন্য জমা দেওয়া গবেষণাপত্রে পাঞ্চ মিশনের এ সাফল্যের প্রাথমিক প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের আশা, ভবিষ্যতে আরও উন্নত তথ্য ও মডেলের মাধ্যমে সৌরঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা আরও আগে দেওয়া সম্ভব হবে। সূত্র: এনগ্যাজেট