এআই প্রতিযোগিতায় ধাক্কা, একদিনেই ৭০ বিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য হারাল আইবিএম

প্রকাশ: বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬
https://techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png নিজস্ব প্রতিবেদক
https://techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png
  ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইবিএম (IBM) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি বলে স্বীকার করেছেন কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অরবিন্দ কৃষ্ণ। তার এই স্বীকারোক্তির পরপরই শেয়ারবাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একদিনেই কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ৭০ বিলিয়ন (৭ হাজার কোটি) ডলার কমে যায় এবং শেয়ারদর সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসে। 

১৯৬৮ সালের পর আইবিএমের ইতিহাসে একদিনে এটিই সবচেয়ে বড় শেয়ারপতন। এমনকি ১৯৮৭ সালের শেয়ারবাজার ধসের সময়কার ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ পতনের রেকর্ডও এবার ভেঙে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থার কাছে মেইনফ্রেম কম্পিউটার, এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার এবং তথ্যপ্রযুক্তি পরামর্শ সেবা দিয়ে আসা আইবিএম এখন এআই যুগের পরিবর্তিত বাস্তবতায় বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

গ্রাহকদের ব্যয়ের ধরণ বদলে যাওয়ায় আয়ের চাপ
বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় অরবিন্দ কৃষ্ণ বলেন, বিশ্বব্যাপী চলমান এআই বিপ্লবের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি যথেষ্ট দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ফলে কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক চুক্তি প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়নি এবং চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল–জুন) আয়ে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। 

তিনি জানান, জুনের শেষ কয়েক সপ্তাহে অনেক গ্রাহক সফটওয়্যার ও প্রচলিত আইটি সেবায় বিনিয়োগ কমিয়ে এআই সার্ভার, স্টোরেজ, মেমরি ও অন্যান্য অবকাঠামোতে ব্যয় বাড়িয়েছেন। গ্রাহকদের এই দ্রুত পরিবর্তিত ব্যয়ের ধরণ কোম্পানির প্রত্যাশার বাইরে ছিল। ফলে সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা থেকে আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। 

আইবিএম দ্বিতীয় প্রান্তিকে মাত্র ১ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, যা গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল এবং ওয়াল স্ট্রিট বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ৬৬ কোটি ডলার কম।

সবচেয়ে বেশি চাপ মেইনফ্রেম ও সফটওয়্যার ব্যবসায়
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সীমিত প্রযুক্তি বাজেটের বড় অংশ ব্যয় করছে এআই অবকাঠামো নির্মাণে। সার্ভার, উচ্চক্ষমতার চিপ, নেটওয়ার্কিং যন্ত্রপাতি ও ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়ায় প্রচলিত সফটওয়্যার ও আইটি সেবার চাহিদা তুলনামূলকভাবে কমছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে আইবিএমের ওপর, কারণ প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসার বড় অংশ এখনও মেইনফ্রেম কম্পিউটার ও এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাংক, বিমান সংস্থা এবং বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার সরবরাহকারী এই ব্যবসা এখন চাপে রয়েছে। 

একই সঙ্গে অরবিন্দ কৃষ্ণ সতর্ক করে বলেন, এআই প্রযুক্তির কারণে সাইবার হামলাও আরও জটিল হয়ে উঠছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো সাইবার নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং প্রযুক্তি বিনিয়োগের অগ্রাধিকার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।

রেড হ্যাট ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ে নতুন কৌশল
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েক বছর ধরেই আইবিএম প্রচলিত মেইনফ্রেম ব্যবসার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উচ্চ মুনাফার ক্লাউড ও হাইব্রিড প্ল্যাটফর্ম ‘রেড হ্যাট’-কেন্দ্রিক ব্যবসা সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। তবে বর্তমান এআই প্রতিযোগিতার কারণে সেই রূপান্তর প্রক্রিয়াও ধাক্কা খেয়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রতিষ্ঠানটি এখন ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি, বিশেষ করে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংকে সামনে আনছে। 

আইবিএম জানিয়েছে, ২০২৯ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রথম বড় আকারের বাণিজ্যিক কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির লক্ষ্য নিয়ে তারা ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করবে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এআইভিত্তিক অংশীদারত্বও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এখন নজর দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলে
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও নতুন এআই উদ্যোগগুলো এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এসব প্রকল্প থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এমন আয় আসছে না, যা আইবিএমের মূল সফটওয়্যার ও অবকাঠামো ব্যবসার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে। 

বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্পের ভাষায়, সফটওয়্যার শিল্পের জন্য এটি একটি কঠিন সময় এবং এআই অবকাঠামোতে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী হলে পুরো খাতই নতুন চাপের মুখে পড়তে পারে। এখন বিনিয়োগকারীদের নজর ২২ জুলাই প্রকাশিত হতে যাওয়া আইবিএমের দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলের দিকে। 

রয়টার্স ও লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপ (এলএসইজি)-এর তথ্য অনুযায়ী, কোম্পানিটির দ্বিতীয় প্রান্তিকের সম্ভাব্য আয় হতে পারে ১৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বিশ্লেষকদের গড় প্রত্যাশা ১৭ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। সূত্র: রয়টার্স, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
 

image

আপনার মতামত দিন