টেলিগ্রাফ থেকে এআই, সাইবার অপরাধের দীর্ঘ যাত্রা

প্রকাশ: শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬
https://techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png নিজস্ব প্রতিবেদক
https://techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png
  ছবি: সংগৃহীত

প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি আমাদের জীবনকে যেমন করেছে সহজ ও গতিময়, তেমনি জন্ম দিয়েছে নতুন ও জটিল সব অপরাধের। একসময় অপরাধীরা সশরীরে ব্যাংকে হানা দিত, আর আজ তারা ইন্টারনেটের আড়ালে বসে কোটি মানুষের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। আধুনিক সাইবার অপরাধের এই ভয়াবহ রূপ হুট করে একদিনে আসেনি, এর শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় প্রায় দুই শতাব্দী আগের এক ঘটনায়। টেলিগ্রাফের যুগে শুরু হওয়া সেই অপরাধ আজ এআই-এর যুগে এসে ডিজিটাল যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।

বিশ্বের প্রথম সাইবার অপরাধের গল্প
সাইবার অপরাধের আদি ইতিহাস রচিত হয়েছিল ১৮৩৪ সালে ফ্রান্সে। তৎকালীন দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম ফরাসি টেলিগ্রাফ ব্যবস্থায় দুই ব্যক্তি গোপনে অনুপ্রবেশ করে আর্থিক বাজারের গোপন তথ্য চুরি করেছিল। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, এটিই ছিল বিশ্বের প্রথম ‘সাইবার অপরাধ’। টেলিগ্রাফ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সেই সময়েই প্রথমবার তথ্য চুরির এক অনন্য নজির সৃষ্টি হয়েছিল।

টেলিফোন যুগেই শুরু হ্যাকিংয়ের অপব্যবহার
আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল ১৮৭৬ সালে টেলিফোন আবিষ্কার করার অল্প সময়ের মধ্যেই এর অপব্যবহার শুরু হয়। টেলিফোন বাজারে আসার মাত্র দুই বছরের মাথায় কিশোর হ্যাকাররা বেলের কোম্পানিতে ঢুকে ফোন কল ভুল ঠিকানায় পাঠানোর মতো ঘটনা ঘটায়। পরবর্তীতে ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে ‘ফ্রিকিং’ নামের এক বিশেষ কৌশলে ফোন হ্যাকিং ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তখন হ্যাকাররা বিশেষ শব্দ বা যন্ত্র ব্যবহার করে টেলিফোন নেটওয়ার্কে প্রবেশ করত এবং বিনা খরচে দূরপাল্লার কল করত।

ডেটা চুরি থেকে এআই প্রতারণা
বর্তমান সময়ে সাইবার অপরাধ আরও ভয়ংকর ও বহুমুখী হয়ে উঠেছে। এখন অপরাধীদের প্রধান লক্ষ্য হলো মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য। ‘ডেটা ব্রোকারেজ’ নামক ব্যবসার মাধ্যমে গোপনে ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ করে তা উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয়। এর পাশাপাশি ‘ট্রিপল-এক্সটরশন র‍্যানসমওয়্যার’ এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই হামলায় অপরাধীরা প্রথমে তথ্য এনক্রিপ্ট করে, পরে তা চুরি করে এবং শেষে তথ্য ফাঁস করার ভয় দেখিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে পরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর ও চেহারা নকল করে প্রতারণার ফাঁদ পাতা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ।

যেভাবে ধাপে ধাপে হয় সাইবার হামলা
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বড় ধরনের সাইবার হামলা সাধারণত চারটি নির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে হ্যাকাররা কোনো নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশের রাস্তা খোঁজে। দ্বিতীয় ধাপে তারা দীর্ঘ সময় গোপনে সেই নেটওয়ার্কে অবস্থান করে তথ্য সংগ্রহ করে। তৃতীয় ধাপে তারা মূল আক্রমণ কার্যকর করে এবং চতুর্থ ধাপে আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সেই ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে।

সাইবার নিরাপত্তায় সচেতনতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সাইবার অপরাধের ধরন প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও জটিল হচ্ছে। এই ডিজিটাল যুগে টিকে থাকতে হলে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। অচেনা কোনো লিঙ্কে ক্লিক না করা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা এবং ব্যক্তিগত তথ্য সবসময় সুরক্ষিত রাখা এখন সময়ের দাবি। প্রায় ২০০ বছর আগে টেলিগ্রাফের হাত ধরে যে অপরাধের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ এআই-চালিত ডিজিটাল যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। তাই সতর্ক থাকাই এখন সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায়। সূত্র: টেকরাডার

image

আপনার মতামত দিন