টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার প্রতিটি স্কুলে পর্যায়ক্রমে কম্পিউটার ল্যাব এবং একটি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। একই সঙ্গে স্থানীয় তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোক্তাদের নিজস্ব উদ্যোগে জাপানি, চাইনিজ ও ইংরেজি ভাষা শেখানোর জন্য ভাষা শিক্ষা ক্লাব গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
শুক্রবার (৩ জুলাই) ঢাকা থেকে নিজ নির্বাচনী এলাকা টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলায় পৌঁছে টানা প্রায় আট ঘণ্টায় আটটি কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন মন্ত্রী। বিভিন্ন পথসভা, উন্নয়ন কার্যক্রম উদ্বোধন, জনসভা এবং ব্যবসায়ীদের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি উন্নয়ন, সুশাসন ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তারের বার্তা দেন।
ধনবাড়ী-মধুপুরে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, দুর্নীতি, মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলে কোনো ধরনের অপরাধের স্থান হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ বিষয়ে কঠোর থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দিনব্যাপী সফরে বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় বাসিন্দারা ফুল দিয়ে মন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। শিশু, নারী, প্রবীণ ও তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গারো ও কোচ সম্প্রদায়ের সদস্যরা নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় তাঁকে স্বাগত জানান। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়।
জুমার নামাজ আদায়ের পর মন্ত্রী ধনবাড়ী নবাব ঈদগাহ ও খেলার মাঠের মাটিভরাট কাজের উদ্বোধন করেন। কোদাল দিয়ে মাটি কেটে কাজের সূচনা করেন তিনি। এ সময় ধনবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূরজাহান আক্তার সাথীও তাঁর সঙ্গে অংশ নেন।
ধনবাড়ীর চারটি স্কুল ও মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত পৃথক সমাবেশে মন্ত্রী তাকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করায় স্থানীয় জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
যদুনাথপুরে এক পথসভায় তিনি বলেন, ধনবাড়ী-মধুপুরের মানুষের ভোট ও আস্থার কারণেই তিনি সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। জনগণের এই আস্থার প্রতিদান উন্নয়নের মাধ্যমে দিতে চান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে কাজ শুরু করেছে। পর্যায়ক্রমে রাস্তা, সেতু, কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় স্থাপনাসহ সব ধরনের উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম বা নিম্নমানের কাজ গ্রহণযোগ্য হবে না। ঠিকাদারদের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করতে হবে। কোথাও অনিয়ম দেখা গেলে স্থানীয় জনগণকে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে আহ্বান জানান তিনি।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে তিনটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন। এখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য নির্বাচনী এলাকার মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, গত ১৭ বছরে যেসব উন্নয়ন হয়নি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উত্থাপিত দাবির দীর্ঘ তালিকাই তার প্রমাণ। সব যৌক্তিক দাবি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়ানোর পরিবর্তে বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা নিয়েই কাজ করতে চান। যেসব দাবি বাস্তবায়নে সময় বা নীতিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেগুলোর বিষয়েও জনগণকে খোলামেলা জানানো হচ্ছে।
শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রতিটি স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠা এবং ধনবাড়ীতে একটি টিটিসি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি স্থানীয় তরুণদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করতে জাপানি, চাইনিজ ও ইংরেজি ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষ নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন। উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, অতীতে অল্প কাজ করে বেশি লাভ করার সংস্কৃতি ছিল। এখন সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে ন্যায্য মুনাফার ভিত্তিতে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। বিজয়ী ও পরাজিত সবাইকে একসঙ্গে কাজ করে ধনবাড়ীকে একটি মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
দিনের শেষ কর্মসূচি হিসেবে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ধনবাড়ী উপজেলা ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির নতুন ভবন নির্মাণ কাজ উদ্বোধনের পর নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটিকে সংবর্ধনা এবং অন্তর্বর্তী কমিটিকে বিদায় জানানো অনুষ্ঠানে যোগ দেন মন্ত্রী। সেখানে ব্যবসায়ীদের বিজয়ী ও বিজিত সবাইকে একসঙ্গে মিলে দেশের উন্নয়নে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সফরকালে তার সঙ্গে ছিলেন ধনবাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ এম আজিজুর রহমান, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মো. শামসুজ্জামান সুরুজ এবং মো. এনামুল হক (ভিপি)।
এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, সুধীজন এবং বিপুলসংখ্যক স্থানীয় মানুষ উপস্থিত ছিলেন।