ছোটবেলায় পাইলট হয়ে বিমানে চড়ে আকাশে ওড়ার ইচ্ছে হলেও স্কুলজীবনে এসে রাজনীতির প্রতি প্রবল টান অনুভব করেন তানভীর হাসান সৈকত। সময়ের পালা-বদলে আজ তিনি নিজের যোগ্যতায় দেশের ছাত্ররাজনীতিতে একটা আলাদা জায়গা তৈরি করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জনপ্রিয় ছাত্রনেতা। অন্যদিকে, মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য জাতিসংঘ থেকে পেয়েছেন 'রিয়েল লাইফ হিরো'র স্বীকৃতি।
বলছিলাম বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের উপ-সমাজসেবা সম্পাদক এবং সাবেক ডাকসু সদস্য তানভীর হাসান সৈকতের কথা। অদম্য আত্মপ্রত্যয়ী সৈকতের ছাত্রলীগের রাজনীতিতে এই পর্যন্ত আসা এবং রিয়েল লাইফ হিরো হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে আরো নানান ঘটনা। তাহলে কী সেই ঘটনা? চলুন জেনে নেয়া যাক।
সৈকতের জন্ম লক্ষ্মীপুর জেলায় সদরে। বাবা পেশাগতভাবে আইনজীবী হলেও নিজের স্বপ্ন পূরণে শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছেন। বাবার স্বপ্ন ছিল নিজের হাতে একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার। শেষে ওকালতি বাদ দিয়ে ‘লক্ষ্মীপুর পৌর কিন্ডার গার্ডেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাও পেশায় শিক্ষক। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সৈকত সবার বড়।
সৈকতের পিতামহ ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একনিষ্ঠ ভক্ত। বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আওয়ামীলীগের কর্মী হিসেবে মানুষের সেবা দিয়ে গেছেন। পিতামহ লক্ষ্মীপুর পৌর আওয়ামী লীগের আমৃত্যু সহ সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। কখনও দলের কোন সুযোগ-সুবিধা নেননি। গ্রামে কারো কোনো সমস্যা হলে নিজে গিয়ে সমাধান করেছেন। দলের কেউ বিপদে পড়লে নিজের জমি বিক্রি করেও আর্থিকভাবে সাহায্য করেছেন। কোন অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। পিতামহের এই বিষয়গুলো ছোটবেলায় দেখে দেখে বড় হয়েছেন সৈকত।
সৈকতের ভাষ্য, পিতামহ সবসময় আমাকে গ্রামের রাজনৈতিক মিটিং, আলোচনা সভায় কোলে করে নিয়ে যেতেন। এভাবে তিনি কখন যে আমার শিশু মনে রাজনীতির বীজ বুনে দিয়েছেন সেটা বুঝে ওঠতে পারিনি। মেঝো কাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্নেল। কলেজ জীবনে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাকসুর কালচারাল সেক্রেটারি ছিলেন। ছিলেন সোহরাওয়ার্দী হলের ছাত্রলীগের সভাপতি। বাবা রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও পরবর্তীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে সবসময় পরিবারে রাজনৈতিক নেতারা আসা-যাওয়া করতেন। তারা রাজনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতেন। এসব বিষয়গুলো আমাকে রাজনীতির বিষয়ে জানার আগ্রহ তৈরি করে।
হাইস্কুলে এসে রাজনীতির বিষয়ে জানার আগ্রহটা আরো তীব্র হয় সৈকতের। কেন এমনটা হয়েছে? তিনি বলেন, বিএনপির সময়কালে তখন পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস বিকৃতি করে পড়ানো হতো। ‘স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান’ বলে পড়ানো হতো। রবিন্দ্র চক্রবর্তী নামে ইতিহাসের একজন শিক্ষক ছিলেন। বইয়ের লেখা পড়ানোর পর তিনি বলতেন, এবার বইটা সবাই বন্ধ করো। এতক্ষণ যা পড়েছো সেটা ছিল মিথ্যে। এখন সত্যটা বলি, সবাই মন দিয়ে শোন। তখন তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনাদর্শ, কাজ, দেশ ও মানুষের জন্য লড়াই, সংগ্রামের গল্প বলতেন। ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভুত্থান, স্বাধীনতার যুদ্ধ এসব বিষয়গুলো যতই জেনেছি ততই আমার কিশোর মনে দোলা দিতো। অবচেতন মনে রাজনীতির প্রতি আমার ভেতরে আলাদা একটা ভালোলাগা শুরু হয়।
স্কুলজীবন থেকেই নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে সৈকতের। পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। স্কুলে বিভিন্ন প্রোগ্রামে, অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দিতে পছন্দ করতেন। সৈকত বলেন, স্কুলে ছাত্র হিসেবে মোটামুটি ভালই ছিলাম। তবে খুব দুষ্টু ছিলাম। আবার বেয়াদব না। স্পষ্টবাদী ও প্রতিবাদী ছিলাম। সবসময় যেকোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতাম। আমার ব্যবহার ও নেতৃত্বের গুণাবলীর জন্য সব শিক্ষকরা আমাকে খুব আদর করতেন।
এভাবে স্কুলের স্বর্ণালী সময়টা খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায় সৈকতের। পৌর শহীদ স্মৃতি একাডেমী লক্ষ্মীপুর থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসি পাস করে উচ্চশিক্ষা লাভে চলে আসেন ঢাকায়। ভর্তি হন ঢাকা সিটি কলেজে। কলেজ ক্যাম্পাসে এসেই যুক্ত হন ছাত্ররাজনীতির সাথে।
সৈকত বলেন, বেসরকারি কলেজ হওয়াতে ছাত্ররাজনীতি করলেও আমার কোন পদপদবী ছিল না। তখন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের দায়িত্বে ছিলেন আজিজুল হক রানা ভাই। তাদের নেতৃত্বে ছাত্ররাজনীতি শুরু করি। এরপর ধানমন্ডি ও কলাবাগান থানা ভাগ হয়ে গেলে পরে হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ইয়াফেজ আহমেদ সামি ভাইয়ের সাথে যোগ দেই। হাজারীবাগ লোকাল রাজনীতির সাথে যুক্ত হই।
পড়াশোনা ও ছাত্ররাজনীতির ব্যস্ততায় কেটে যায় কলেজের স্মৃতিময় দিনগুলি। মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করেন সৈকত। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পালা। সংস্কৃতির প্রতি আর্কষণের কারণে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পার্ফমেন্স স্টাডিজ বিভাগে। ওঠেন ঢাবির জসিম উদ্দিন হলে। শুরু হয় তার ছাত্রজীবনের এক নতুন অধ্যায়। হলের প্রথমদিন থেকেই তিনি ছাত্র রাজনীতির কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হন।
সৈকত বলেন, ৫ জানুয়ারিতে নির্বাচনের পরবর্তী সময় বকশীবাজার বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে ছাত্রলীগের উপরে যে হামলা হয়, ওই আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেই এবং মারাত্মকভাবে আহত হই। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ এবং ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান মোল্লা ভাই আমার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় ক্লাসে উপস্থিতি কম ছিল। পরে আমাকে ডিপার্টমেন্টে এক বছর লস করতে হয়েছে। সুস্থ হয়ে নিয়মিত ক্লাস শুরু করি। সেসাথে ঢাবির ছাত্রলীগের সাথে সক্রিয়ভাবে সব কিছুতে অংশগ্রহণ করতে থাকি।
যেকোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, ক্যাম্পাসের সিনিয়র ভাইদের শ্রদ্ধা, সম্মান, আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্বের গুণাবলী ও সৎসাহসের জন্য অল্পদিনের মধ্যেই রুমমেটদের সকলের প্রিয় হয়ে ওঠেন সৈকত। যুক্ত হন হল ছাত্রলীগের রাজনীতিতে। আত্মনিবেদিত মনোভাব ও মানুষের জন্য কাজ করার জন্য ঢাবি ছাত্রলীগের সদস্য এবং পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের কার্যকরী সদস্য করা হয় তাকে।
সৈকত বলেন, এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এর সদস্য নির্বাচিত হই। এছাড়াও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের উপ-সমাজসেবা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।
ঢাবিতে ছাত্রদের থাকার আবাসিক সমস্যার ফল হলো গণরুম ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে নেতাদের এককভাবে রুম দখলে রাখায় সমস্যা আরো বেশি হয়েছে। হল প্রশাসন বারবার উদ্যোগ নিয়েও সমস্যা সমাধান করতে পারেনি। তাই ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে নির্বাচিত এই নেতা লড়েছেন গণরুম সমস্যার সমাধানে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দিয়েছেন ৬ দফা দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি। ভিসি অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান সেসময় আশ্বাস দিলেও পূরণ হয়নি একটি দাবিও। যার প্রতিবাদে নিজের বৈধ সিট ছেড়ে গণরুমে ওঠেন এই ছাত্র নেতা। নিজের রুমে গণরুমের কয়েকজন ছেলেকে তুলেন।
সবসময় মানুষের কল্যাণে কাজ করে মনে একরকম প্রশান্তি পান এই ছাত্রনেতা। ২০২০ সালের মার্চ মাস। করোনা মোকাবিলায় নাস্তানাবুদ ছিল গোটা বিশ্ব। বাংলাদেশেও এর প্রকোপ বেড়েছিল ব্যাপকভাবে। আক্রান্ত হচ্ছিল হাজার হাজার মানুষ। দীর্ঘ হচ্ছিল লাশের মিছিল। এই পরিস্থিতিতে ১৮ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে যায়। সব শিক্ষার্থীরা যখন বাড়ি চলে যায় তখন সৈকতের মাথায় আসে একটা ব্যতিক্রমী ভাবনা। রাজধানীতে যাদের মাথার উপরে কোনো ছাদ নেই, রাত কাটে ফুটপাথে, যাদের কপালে জোটে না দু’বেলা একমুঠো খাবার, এমন অভুক্তদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে টিএসসিতে ছিন্নমূল ভাসমান-অসহায় মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা করেন। ২৪ মার্চ, নিজের জমানো ১৩ হাজার টাকা দিয়েই অসহায় মানুষের খাবার দেয়া শুরু করেন তিনি।
সৈকত বলেন, একটা জিনিস নিশ্চিত ছিলাম, ভালো কাজে কখনো আর্থিক সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তাই নিজের যা সম্বল ছিল তা দিয়েই এই উদ্যোগ শুরু করি। প্রথম দিন খাওয়ানোর পর বিষয়টা নিয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দেই। ওই স্ট্যাটাসে সাড়া পেতে শুরু করি। আমার পাশে এসে দাঁয়ড়ায় শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সমাজ সেবক, সাংবাদিক, পুলিশ, রাজনীতিবিদসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
করোনার প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে প্রথম ও দ্বিতীয় লকডাউনে ১২১দিন টিএসসি এলাকায় থাকা ভাসমান মানুষদের দুইবেলা খাবারের ব্যবস্থা করেন সৈকত। প্রতিদিন দু’বেলা গড়ে হাজার জন মানুষকে খাইয়েছেন তিনি। এরপর দেশে করোনা প্রকোপ কিছুটা কমে এলে বন্যার প্রকোপ শুরু হয়। তখন তিনি সুনামগঞ্জে চলে যান বন্যা কবলিত মানুষকে সহায়তা করতে। একইভাবে শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে সেবামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন তিনি। এছাড়াও সুনামগঞ্জের বেদেপল্লী ও গুচ্ছগ্রামেও খাবার সরবরাহ করেছেন।
মানবিক কাজের জন্য চার বাংলাদেশি তরুণকে ‘রিয়েল লাইফ হিরো’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। ২০২০ সালে ১৯ আগস্ট বিশ্ব মানবিক দিবস উপলক্ষে তাদের মানবিক কাজে অনুপ্রেরণা যোগাতে জাতিসংঘ এই চার বাংলাদেশি তরুণকে বিশেষ এই স্বীকৃতি দেয়। তারা হলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর হাসান সৈকত, ব্র্যাকের প্রকৌশলী রিজভী হাসান, অনুবাদক সিফাত নুর ও আঁখি।
অনুভূতি ব্যক্ত করে সৈকত বলেন, জাতিসংঘের মতো একটি জায়গা থেকে ‘রিয়েল লাইফ হিরো’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া গর্বের ব্যাপার। জাতিসংঘের এই স্বীকৃতি ভবিষ্যতে গণমানুষের জন্য কাজ করতে আমাকে উৎসাহ যোগাবে, আমার কাজের গতি বাড়িয়ে দিবে৷ ভবিষ্যতে দেশের মানুষের জন্য পূর্বের মতোই আমি সবসময় কাজ করে যেতে চাই।
করোনাকালে ছিন্নমূল মানুষের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দিতে যারা আর্থিকভাবে, বিভিন্ন খাবারের আইটেম এবং পরামর্শ দিয়ে পাশে ছিলেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সৈকত। বিশেষ করে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানয়েছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে। সেসাথে ক্যাম্পাসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী, আত্মীয়-স্বজনসহ সকল শ্রেণি-পেশার উদার মানুষদের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি।
সৃজনশীল কাজ করতে ভীষণ পছন্দ করেন সৈকত। টিএসসির পাশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ৩ নম্বর গেটের সামনে বসে একদিন চা খাচ্ছিলেন। পাশেই ছিল ময়লা আর্বজনার স্তুপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাসহ যে কেউ এখানে এসে চায়ের আড্ডা দিতে দিতে প্রয়োজনীয় বইগুলো সংগ্রহ করে পড়তে পারবে। বিষয়টি নিয়ে কয়দিন ভাবেন। পরে দেখেন আইডিয়াটা বাস্তবায়ন করলে নিশ্চয় মন্দ হবে না। সে আইডিয়া থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে একটি উন্মুক্ত লাইব্রেরি তৈরি করেছেন তিনি।
উন্মুক্ত পাঠাগারের উদ্যোক্তা সৈকত বলেন, ঢাবির ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে যারা চায়ের আড্ডা দিতে আসেন, তারা এখন পড়তে পারবেন বিভিন্ন ধরনের বই। উন্মুক্ত লাইব্রেরির ভেতরটা সাজানো-গুছানো। কালো কাঠের পাটাতনের ওপর তিন তাকওয়ালা কাঠের একটি রঙিন বইদানিতে সাজানো আছে বিভিন্ন লেখকের বই। সৌন্দর্য বাড়াতে রাখা হয়েছে বাহারি গাছ। এছাড়াও পাঠাগারটির একপাশে সাঁটানো হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত নানা ছবি। আঁকা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী উঁচু করা ছবি, যা মনের করিয়ে দেয় ৭ই মার্চের সেই স্বাধীনতার ঘোষণার কথা। এখানে তিনটি ক্যাটাগরির বই রয়েছে। প্রথমত, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার সূত্র ও বাংলাদেশের ইতিহাস। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশি সাহিত্য, তৃতীয়ত, বিদেশি সাহিত্য। শুরুতে আমার জমানো আড়াইশ বই দিয়ে লাইব্রেরির যাত্রা শুরু হলেও পরে উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন ঢিাবির শিক্ষক, ছাত্র, শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু-বান্ধব, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এখন প্রায় ১৮০০ বই রয়েছে এই লাইব্রেরিতে।
থিয়েটারের প্রতি অন্যরকম ভাললাগা ও ভালোবাসা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে থিয়েটার অ্যান্ড পার্ফমেন্স নিয়ে পড়াশোনা করা ছাত্রনেতা সৈকতের। ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি ক্লাসের বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা ও প্র্যাকটিকেল বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক সৃজনশীল কাজ করেছেন এই নাট্যপরিচালক। আধুনিক সমাজে অবহেলিত পথশিশু ও নারীদের নির্যাতন, ধর্ষণ, শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় সমাজ সচেতনতামূলক পথনাট্য উপস্থাপন করেছেন।
সৈকতের ভাষ্য, সবসময় চেষ্টা করি সমাজের অসহায়দের প্রতি করা অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার, নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঝাঁক শিল্পমনা শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকা শহরের কয়েটি স্থানে গীতিনাট্য প্রদর্শনী করেছি। এই গীতিনাট্যের পটভূমি ছিল স্বপ্নের পদ্মাসেতু বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, বিশ্বব্যাংকের পিছুটান ও মিথ্যাচার, রাজনৈতিকভাবে গণমানুষের ভেতরে যে গুজব ছড়ানো হয়েছে, সেসব রুখে দিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার দৃঢ় সিদ্ধান্ত, সুদক্ষ নেতৃত্বে নির্মিত হয়েছে স্বপ্ন-সাহস-অহমিকার পদ্মা সেতুর উপ্যাখ্যান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পার্ফমেন্স স্টাডিজ বিভাগে মাস্টার্সে পড়াশোনা করছেন অদম্য এই ছাত্রনেতা। এছাড়াও তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটির সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য।
তরুণ এই ছাত্রনেতা স্বপ্ন দেখেন এশিয়ার সবচেয়ে বড় একটা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করার। যেখানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষেরা এসে বই সংগ্রহ করবে। বই পড়বে। এটা ব্যক্তি উদ্যোগে সম্ভব না। এর জন্য সরকারের সহায্য দরকার।
সৈকত বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে ‘উন্মুক্ত লাইব্রেরি’ প্রতিষ্ঠা আমার স্বপ্নের যাত্রার প্রথম অধ্যায় শুরু। পরবর্তী সময়ে রাজধানীর স্থান বিবচনায় আরো উন্মুক্ত পাঠাগার স্থাপনের চিন্তাও রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকে পাঠাগারের জন্য বই ডোনেট করেছেন। আপাত দৃষ্টিতে ছোট উদ্যোগ মনে হলেও আমার কাছে এটা বড় কিছুর শুরু। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন দেশের প্রত্যেকটি জেলায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে উন্মুক্ত লাইব্রেরির প্রচলন তৈরি হবে ইনশাআল্লাহ।