শামুকের সেরাম কীভাবে বদলে দিল কে-বিউটির শিল্প

প্রকাশ: শনিবার, ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬
https://techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png নিজস্ব প্রতিবেদক
https://techvoice24.com/assets/images/logoIcon/logo.png
  ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রসাধনী শিল্প বা ‘কে-বিউটি’ বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। শামুকের নির্যাস (স্নেল মিউসিন) থেকে শুরু করে চাল ধোয়া পানি-দক্ষিণ কোরিয়ার এ উদ্ভাবনগুলো বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের নিত্যদিনের স্কিনকেয়ার রুটিনের অংশ।

২০২৫ সালের প্রথমার্ধের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রসাধনী রফতানি গত বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এ অভাবনীয় প্রবৃদ্ধির ফলে ফ্রান্সকে পেছনে ফেলে দেশটি এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রসাধনী রফতানিকারক দেশ, যার সামনে রয়েছে কেবল যুক্তরাষ্ট্র।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী কে-পপ ও কে-ড্রামার মতো কোরিয়ান সংস্কৃতির জনপ্রিয়তা এ প্রসাধনী শিল্পের পথ প্রশস্ত করেছে। ২০২৪ সালে কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারের মূল্য ছিল প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে নতুন রেকর্ড স্পর্শ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কে-বিউটির এই সাফল্যের মূলে রয়েছে তাদের অবিশ্বাস্য উৎপাদন গতি। যেখানে পশ্চিমা বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলোর একটি পণ্য বাজারজাত করতে এক থেকে তিন বছর সময় লাগে, সেখানে কোরিয়ান ব্র্যান্ডগুলো মাত্র ছয় মাসের মধ্যে গবেষণাগার থেকে পণ্যটি খুচরা বিক্রেতার হাতে পৌঁছে দিতে সক্ষম।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ৩০ হাজার বিউটি ব্র্যান্ড একটি শক্তিশালী শিল্প ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। কসম্যাক্স-এর মতো বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বের সাড়ে চার হাজারেরও বেশি ব্র্যান্ডের জন্য উন্নত ফর্মুলা ও পণ্য সরবরাহ করছে। আমোরেপ্যাসিফিকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন স্বয়ংক্রিয় কারখানার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ চাহিদা মেটাচ্ছে।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রসাধনী শিল্পের প্রধান বাজার ছিল চীন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন ও চীনের নিজস্ব ব্র্যান্ডগুলোর উত্থানের কারণে কোরিয়ান কোম্পানিগুলো তাদের কৌশল পরিবর্তন করেছে।

আমোরেপ্যাসিফিকের প্রধান নির্বাহী কিম সেউং-হোয়ান জানান, গত বছর তাদের উত্তর আমেরিকার ব্যবসা প্রথমবারের মতো চীনের ব্যবসাকে ছাড়িয়ে গেছে। এখন তাদের মূল লক্ষ্য জাপান, ইউরোপ ও ভারতের মতো উদীয়মান বাজারগুলো। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত ১৫ শতাংশ আমদানিশুল্ক এইরপ্তানি অগ্রযাত্রায় কিছুটা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কে-বিউটির এই জয়জয়কারের পেছনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের ভূমিকা অপরিসীম। ‘গ্লাস স্কিন’ বা কাঁচের মতো স্বচ্ছ ত্বকের মোহ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে। তবে এ ঝোঁকের নেতিবাচক দিক নিয়েও সরব হচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। মাত্রাতিরিক্ত স্কিনকেয়ার কন্টেন্ট তরুণদের মধ্যে সৌন্দর্য নিয়ে উদ্বেগ এবং অপ্রয়োজনীয় খরচের প্রবণতা বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন সৌন্দর্য বিষয়ক ইনফ্লুয়েন্সার লিয়া ইয়ু।

এ শিল্পের গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কে-বিউটিকে ‘কৌশলগত জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে দক্ষিণ কোরিয়া সরকার। এ স্বীকৃতির ফলে রপ্তানি ও গবেষণায় বিশেষ কর সুবিধা ও প্রণোদনা পাবে খাতটি।

প্রসাধনী শিল্পটি এখন আর কেবল একটি ভাইরাল ট্রেন্ড নয়, বরং দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতির এক শক্তিশালী স্তম্ভ। লরিয়ালের মতো বৈশ্বিক জায়ান্টরা এখন কোরিয়ান কোম্পানি অধিগ্রহণ করছে, যা প্রমাণ করে যে বিশ্ব প্রসাধনী বাজারের ভবিষ্যৎ এখন সিউল থেকেই নির্ধারিত হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি 

image

আপনার মতামত দিন