বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এ খাতের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে সিমেন্ট, রড, ইট, টাইলস, কাচ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, আসবাবসহ অসংখ্য সহযোগী শিল্প। ফলে আবাসন খাতের বিকাশের সঙ্গে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও জড়িয়ে আছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতি, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের উচ্চ সুদহার, নীতিগত পরিবর্তন এবং দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে খাতটি বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে পরিবর্তিত বাজার পরিস্থিতি নতুন কিছু সম্ভাবনাও তৈরি করছে। ফলে বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাত এখন সংকট ও সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
বাজারে ধীরগতি, বাড়ছে খরচ
বর্তমানে দেশের রিয়েল এস্টেট বাজারে একধরনের ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় অস্থিরতা এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাবে রড, সিমেন্ট, ইটসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি যোগ হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
অন্যদিকে ব্যাংকঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় চাপ তৈরি হয়েছে ক্রেতা ও ডেভেলপার—উভয়ের ওপর। ডেভেলপারদের জন্য প্রকল্প পরিচালনা ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের জন্য গৃহঋণের কিস্তি পরিশোধও কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে নতুন ফ্ল্যাটের বিক্রি কমার পাশাপাশি অনেক প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়নেও চাপ তৈরি হয়েছে।
অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা
রিয়েল এস্টেট খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকল্প অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ), নতুন বিল্ডিং কোড এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদন ও ছাড়পত্রের জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লাগছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়লে নির্মাণ ব্যয়ও বাড়ে। অন্যদিকে বিক্রয় ধীর থাকলে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প হস্তান্তর ও নির্মাণের মান বজায় রাখা ডেভেলপারদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দ্রুত, স্বচ্ছ ও সমন্বিত অনুমোদনব্যবস্থা এখন এ খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন।
ঢাকার বাইরে বাড়ছে সম্ভাবনা
ঢাকায় জমির স্বল্পতা ও জমির উচ্চমূল্যের কারণে আবাসন খাত ধীরে ধীরে শহরের কেন্দ্র থেকে আশপাশের এলাকায় বিস্তৃত হচ্ছে। কুড়িল-পূর্বাঞ্চল ও এক্সপ্রেসওয়ে-সংলগ্ন এলাকা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার সম্প্রসারিত অংশ, জলসিঁড়ি, উত্তরা তৃতীয় পর্ব এবং মেট্রোরেল-সংযুক্ত মিরপুর ও উত্তরা অঞ্চলে আবাসন উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে গণপরিবহন ও সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নের কারণে শহরের কেন্দ্র থেকে কিছুটা দূরের এলাকাগুলোও ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এর ফলে আবাসন বাজারে একটি বিকেন্দ্রীকরণ প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, কক্সবাজার ও রাজশাহীর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরেও আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্পত্তির চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে কক্সবাজারের মতো পর্যটনকেন্দ্রিক এলাকায় সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্ট ও রিসোর্টভিত্তিক সম্পত্তি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বদলে যাচ্ছে প্রপার্টি কেনাবেচার ধরন
প্রযুক্তির ব্যবহার রিয়েল এস্টেট খাতেও পরিবর্তন আনছে। প্রপটেক বা প্রপার্টি টেকনোলজির মাধ্যমে ক্রেতারা এখন ঘরে বসেই বিভিন্ন প্রকল্প সম্পর্কে তথ্য জানতে এবং ভার্চুয়াল ট্যুরের মাধ্যমে ফ্ল্যাট বা অন্যান্য সম্পত্তি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডেটা অ্যানালিটিকসের ব্যবহারও ধীরে ধীরে বাড়ছে। কোনো এলাকার বাজারমূল্যের প্রবণতা, সম্ভাব্য চাহিদা, বিনিয়োগের সুযোগ এবং সম্ভাব্য রিটার্ন বিশ্লেষণে এসব প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ বাড়ায় ক্রেতা ও ডেভেলপারের মধ্যে স্বচ্ছতা তৈরির সম্ভাবনাও বাড়ছে। তবে অনলাইন বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ঠেকানোও গুরুত্বপূর্ণ।
শক্তিশালী হচ্ছে সেকেন্ডারি বাজার
নতুন ফ্ল্যাটের পাশাপাশি সেকেন্ডারি বা পুনঃবিক্রয়যোগ্য প্রপার্টির বাজারও গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেক ক্রেতা তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে তৈরি বা রেডি ফ্ল্যাট পাওয়ার কারণে পুরোনো বা পুনঃবিক্রয়যোগ্য সম্পত্তির দিকে ঝুঁকছেন।
সেকেন্ডারি মার্কেট সক্রিয় থাকলে সম্পত্তির লেনদেন বাড়ে এবং বাজারে অর্থের প্রবাহও বজায় থাকে। তবে এ ধরনের সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাকে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে।
কেনার আগে যে বিষয়গুলো যাচাই জরুরি
জমি, ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক সম্পত্তি কেনার আগে কয়েকটি বিষয় অবশ্যই যাচাই করা উচিত।
প্রথমত, আইনি নথিপত্র। সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান, নামজারি, ডিসিআর ও খাজনা রশিদ হালনাগাদ আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, অনুমোদন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা, নির্মাণসংক্রান্ত অনুমোদন এবং প্রকল্পের অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি পরীক্ষা করা জরুরি।
তৃতীয়ত, ডেভেলপারের সুনাম ও অতীত রেকর্ড। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের পূর্ববর্তী প্রকল্প, সময়মতো হস্তান্তরের ইতিহাস, গ্রাহকসেবা এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠনের নিবন্ধন বা সনদ যাচাই করা উচিত।
টেকসই আবাসনের দিকে যেতে হবে
ভবিষ্যতের রিয়েল এস্টেট প্রকল্পে শুধু কম দামে ফ্ল্যাট তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে গুণগত মান, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
গ্রিন হাউজিং, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার একটি প্রকল্পকে আরও টেকসই করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এসব ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে বাসিন্দাদের পরিচালন ব্যয় কমাতেও সহায়তা করতে পারে।
প্রয়োজন নীতিগত সহায়তা
রিয়েল এস্টেট খাতের টেকসই বিকাশের জন্য শুধু ডেভেলপারদের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর সরকারি নীতিসহায়তা।
প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক কম সুদের আবাসন ঋণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহীদের জন্য বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা তৈরি করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সম্পত্তি নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট কর কাঠামোকে আরও সহজ ও যৌক্তিক করা প্রয়োজন। লেনদেনের ব্যয় কমানো গেলে বৈধভাবে সম্পত্তি কেনাবেচার প্রবণতা বাড়তে পারে এবং রাজস্ব আদায়ও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রকল্প অনুমোদনে ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ বা একক সেবা কাঠামো কার্যকর করা জরুরি। রাজউক, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাসসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন ও ছাড়পত্র সমন্বিতভাবে পাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয়-দুটিই কমানো সম্ভব।
সংকটের মধ্যেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাত শুধু একটি ব্যবসায়িক খাত নয়; মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা আবাসনের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। একই সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য সহযোগী শিল্প, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ।
বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা, আইনি ও নীতিগত সংস্কার করা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন।
সঠিক পরিকল্পনা, বাস্তবসম্মত নীতি এবং সময়োপযোগী প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে বর্তমান সংকটই বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাতের নতুন রূপান্তরের ভিত্তি হতে পারে। মানুষের আবাসনের চাহিদা, নগরায়ণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে এ খাতের সামনে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা রয়েছে।
লেখা: এম কে আনোয়ার হাসান, সিইও, জেমস কনস্ট্রাকশন লি.